শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৫

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিশেষ আইন ”আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী কনভেনশন, ১৯৮৯” অনুসারে ট্রাইবেল ও আদিবাসী কারা?

আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী কনভেনশন, ১৯৮৯ এর অনুচ্ছেদ ১ এ ‘ট্রাইবেল’ ও ‘আদিবাসী’ সম্পর্কে বলা হয়েছে:

১. এই কনভেনশন প্রযোজ্য হবে-

(ক) স্বাধীন দেশসমূহের ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, যাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্য অংশ থেকে স্বতন্ত্র এবং যাদের মর্যাদা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব প্রথা কিংবা ঐতিহ্য অথবা বিশেষ আইন বা বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়;

(খ) স্বাধীন দেশসমূহের জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, যাদের আদিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয় এই বিবেচনায় যে তারা রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপনের কালে অথবা বর্তমান রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের কালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগোলিক ভূখণ্ডে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী জাতিগোষ্ঠীর বংশধর এবং তারা তাদের আইনগত মর্যাদা নির্বিশেষে তাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অক্ষুন্ন রাখে।

২. এই কনভেনশনের বিধানাবলী যেসব জনসমষ্টির বেলায় প্রযোজ্য সেই জনসমষ্টির চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে আদিবাসী কিংবা ট্রাইবাল হিসেবে আত্মপরিচয়কেই মৌলিক উপাদান হিসেবে গণ্য করা হবে।

৩. এই কনভেনশনের জাতিগোষ্ঠী শব্দটির ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনে সন্নিবেশিত শব্দটির যে অধিকারের নিহিতার্থ রয়েছে সেভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

[Source: ILO Convention No 169]


জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক Sub-Commission-এর Special Rapporteur Mr. Jose Martinez Cobo-এর মতে “আদিবাসী কারা”?

“আদিবাসী বা Indigenous Communities, PeoplesNations হল ওরা, যাদের প্রাগ্-আগ্রাসন ও প্রাগ্-উপনিবেশিক সমাজগুলির সাথে একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিক সম্পর্ক আছে, এ সম্পর্ক তাদের ভূখণ্ডের উপর গড়ে উঠেছে এবং ঐ ভূখণ্ডের মধ্যে বর্তমান সমাজের অন্যান্য সেক্টরগুলি থেকে তাদেরকে স্বাতন্ত্র্য বা অংশ হিসেবে মনে করে। তারা বর্তমানে নিজেদের সমাজে নিজেদের মধ্যে অনাধিপত্যমূলক সেক্টর গঠন করে এবং তারা তাদের পৌরাণিক ভূখণ্ডগুলিও Peoples হিসেবে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইনগত পদ্ধতিগুলির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ধারাবাহিক অস্তিত্ব রক্ষা করছে ও তাদের জাতিগত পরিচিতি সংরক্ষণ, উন্নয়নও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্থানান্তর করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।” [Sources: E/CN.4/Sub.2/1986/7(1983)]

শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

AFG observed International Day for Peace at Rangamati

আজ ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ আর্র্ন্তজাতিক শান্তি দিবস। ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভা ২১ সেপ্টেম্বর দিনটিকে আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর দুই দশক পর ২০০১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বিশ্বেও রাষ্ট্রসমূহ এই দিনটিকে অহিংস ও যুদ্ধবিরতির দিন হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেছে এবং এই দিনটির প্রতি সম্মান রেখে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকার এবং শান্তি নিয়ে শিক্ষা ও জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য দিনটি পালন করতে সকল রাষ্ট্র, জাতি ও জনগোষ্ঠীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

জাতিসংঘ এ বছরের আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে। এটি হলো “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা: শান্তি স্থাপনের জন্য অন্যতম ভিত [The Sustainable Development Goals: Building Blocks for Peace.]

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের সর্বসম্মতিক্রমে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ২০৩০ সালের এজেন্ডা হিসেবে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে এ সকল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সর্বোচ্চ প্রচেষ্ঠা চালানোর জন্য রাষ্ট্রসমূহকে আহ্বান জানানো হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হলো দরিদ্রের পরিসমাপ্তি, ধরিত্রীকে রক্ষা এবং বিশ্বের মানব জাতির জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। আমাদের সময়ের মধ্যে শান্তি নিশ্চিত করার জন্য টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ উন্নয়ন ও শান্তি উভয়ই পরস্পরের পরিপূরক। এরা একে অপরকে প্রভাবিত করে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, এই ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা মানব সমাজের জন্য বিশ্ববাসীর যৌথ স্বপ্ন এবং এটা বিশ্ব নেতৃত্ব ও জনগণের একটা চুক্তি।

‘টেকসই’ মানে হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতাকে অক্ষত রেখে বর্তমান মানব সমাজের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। বর্তমানের ক্ষুধা, দারিদ্র, প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস, পানির অভাব, সামাজিক অসমতা, পরিবেশ ধ্বংস, বর্ণবাদ ইত্যাদি সমস্যা শান্তির জন্য বড় ধরণের চেলেঞ্জ। এগুলো দ্বন্দ্বের গভীরতাকে বাড়িয়ে দেয়। টেকসই উন্নয়ন দ্বন্দ্বের কারণগুলো নিরসনে সহায়তা করে। শান্তির ভিত্তি তৈরী করে। অপরদিকে, শান্তিও টেকসই উন্নয়ন বেগবান করার অন্যতম শর্ত। তাছাড়া, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬ সরাসরি “শান্তি, ন্যায়বিচার এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান”-এর উপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাছাড়া টেকসই উন্নয়ন অন্য ১৬টি লক্ষ্যও শান্তি অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে।

১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রত্যেকটিই বিশ্ব শান্তির জন্য অন্যতম প্রধান ভিত। এগুলো অর্জনের জন্য আমাদের প্রত্যেককেই একযোগে কাজ করা দরকার। আমাদের ঐক্য শান্তির সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করে। আজ ২১ সেপ্টেম্বর দিনের ২৪টি ঘন্টা থেকেই একটা শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ তৈরীর কাজ সূচনা হোক!

প্রচারে: আদিবাসী ফ্যাসিলিটেটরস্ গ্রুপ, বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৪

Lets develop our society in harmony with nature! - Poster 2014

উন্নয়ন সম্পর্কে আদিবাসীদের ধারণা

বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্ব বিশ্বের জন মানুষের সার্বিক ও টেকসই উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস সম্পর্কিত নানা বিধ মানবিক ও পরিবেশগত সমস্যা মোকাবেলায় ব্যর্থতাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাই, বিশ্ববাসী এখন উন্নয়নের জন্য নতুন বিকল্প পন্থা খুঁজছে। এ প্রেক্ষিতে উন্নয়ন সম্পর্কে আদিবাসীদের ধারণা গুরুত্ব সহকারে বোঝার চেষ্ঠা করা হচ্ছে। অনেকে আদিবাসীদের ধারণার মধ্যেই বিকল্প উন্নয়ন পন্থার মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

আদি কাল থেকেই উন্নয়ন সম্পর্কে আদিবাসীদের ধারণা সমন্বিত প্রকৃতির। উন্নয়ন সম্পর্কে আদিবাসীদের ধারণা তাদের ভূখন্ডের মধ্যে সকল প্রাণ-জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। আদিবাসীদের উন্নয়ন ধারণা অংশগ্রহণভিত্তিক (সকলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ) হওয়ার ফলে উন্নয়নের জন্য লক্ষিত জনগোষ্ঠীরা নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিজেরাই তৈরী করতে পারে। তারা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমাজ স্বপ্নের কথা বলে। স্থানীয় পরিবেশ ও সংস্কৃতি প্রতি সন্মান করে ধীরে ধীরে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হয়। উন্নয়ন সম্পর্কে আদিবাসী ধারণার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহ হলো:-

স্বশাসন: আদিবাসীদের উন্নয়ন ধারণার প্রধান বিষয় হলো স্বশাসন। তৃণমূল পর্যায়ে স্বশাসন নিশ্চিত করাই উন্নয়নের প্রধান লক্ষ্য। যেখানে গ্রামবাসীরা তাদের নিজেদের সামগ্রিক উন্নয়ন স্বপ্ন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কর্মসূচী ও কার্যক্রমসমূহ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারে; এবং এ সকল কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারে।

ভূমি ও সম্পদের উপর যৌথ মালিকানা: এটি একটি মৌলিক উপাদান। গ্রামবাসীদের যৌথ মালিকানাধীন ভূমি ও অন্যান্য সম্পদগুলো চিহ্নিত করা খুবই জরুরী; গ্রামের কল্যাণে এ সকল সম্পদের যৌথ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উন্নয়ন ও প্রসার ঘটানো।

সাংস্কৃতিক পূর্ণগঠন: আদিবাসীদের মানবিক মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্রামবাসীদের জ্ঞান, প্রথা ও চর্চাসমূহ প্রসার ও উন্নয়ন করা; গ্রামবাসীদের মঙ্গল তথা টেকসই উন্নয়নের জন্য সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও চর্চাগুলোর প্রতি সন্মান, উন্নয়ন ও পুণঃউজ্জীবিত করা।

ভূখন্ডগত পরিচিত: আদিবাসীরা সাধারণতঃ একটা সুনির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাস করে থাকে। এ ভূখন্ড তাদের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচিত বহন করে। গ্রাম পর্যায়ে গ্রামবাসীদের ভূখন্ড চিহ্নিত ও এর প্রসার ও উন্নয়নের জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা।
মানবিক মূল্যবোধ: আদিবাসী সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তাদের মানবিক মূল্যবোধ চর্চা। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ও কাজে সমতা, যৌথতা, সহযোগিতা ও সংহতি ইত্যাদি মানবিক মূল্যবোধসমূহ চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়ন সম্পর্কে আদিবাসীদের ধারণা সার্বজনিন। এটা আদিবাসীদের আদর্শগত বিষয়সমূহকে তুলে ধরে এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ ভেদে সমাজের সকল জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য স্বপ্ন দেখে। তাই, পরিবেশগতভাবে টেকসই, অর্থনৈতিকভাবে মানবিক বিকল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের উন্নয়ন ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।